নতুন ভ্যাট আইনের ফাঁদে পড়েছে সরকার ?

Share This
Tags
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট:
 http://newsbdn.com

আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশি-বিদেশি অপশক্তির চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে নতুন ভ্যাট আইনের ফাঁদে পড়েছে সরকার। ভ্যাটের প্রকৃত সংকট আড়াল করতেই ব্যাংকে জমা রাখা টাকায় আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সব পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংসের নীলনকশাও করেছে চক্রান্তকারীরা। এতে ২ কোটি শ্রমিকের কর্মসংস্থান বন্ধ ও ২ লাখ কোটি টাকা পাচারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন বিশ্লেষণ করে দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতির গবেষকরা বলেছেন, সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তুলতেই নির্বাচনের আগে এই ভ্যাট ষড়যন্ত্র চলছে।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন—এফবিসিসিআইর সাবেক উপদেষ্টা ও রাজস্ব বিশ্লেষক মনজুর আহমেদ বলেন, এবারের বাজেট ষড়যন্ত্রমূলক। বড় ভুল করেছে সরকার। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে, এই বাজেট অন্তর্ঘাতমূলক। সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে খেপানোর সুকৌশল পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতরা। যেটা বিএনপি করতে পারেনি, সেটাই বাজেটে করা হয়েছে।

সরকার সমর্থক এই ব্যবসায়ী নেতার মতে, এই বাজেটের মাধ্যমে দেশের ৯৫ শতাংশ ব্যবসায়ীকে খেপিয়ে তোলা হয়েছে। আর আগামী ১ জুলাই থেকে যখন নতুন ভ্যাট আইনসহ বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হবে, তখন ভ্যাটের কারণে সাধারণ মানুষ পাগল হয়ে যাবে। এর সঙ্গে অবশ্যই দেশি-বিদেশি চক্র জড়িত।

শুধু ভ্যাট নয়, পুরো  বাজেটকেই একটা নীলনকশা হিসেবে মূল্যায়ন করেন তিনি। জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে বন্ডেড ওয়্যার হাউসের মাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও চোরাচালান বন্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো পদেক্ষপ নেওয়া হয়নি। ফলে পোশাকশিল্প খাতের পুনঃরপ্তানির শর্তে আনা কাপড়, কেমিক্যাল ও প্যাকেজিংয়ের জন্য আমদানি হওয়া কাগজ-জাতীয় পণ্য খোলাবাজারে চোরাচালানের মাধ্যমে বিক্রি অনেক বেড়ে যাবে। গত বছর বাংলাদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে এই অর্থ পাচার বেড়ে ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। চোরাচালান উসকে দিতেই বাজেটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, দেশি-বিদেশি অপশক্তির ইন্ধনে করা ভ্যাট আইনে ১৫ শতাংশ হারে অর্থ আদায় করা হলে দেশীয় শিল্প ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হবে। এটা একধরনের নীলনকশা। ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার রাজস্ব আদায় বাড়াতে সিগারেট, মাদক ও জর্দার ওপর করহার অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।

কিন্তু দেশীয় শিল্প ধ্বংসে পা দেওয়া উচিত হয়নি। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমএফের চাপে নতুন ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ককর আইন-২০১২ করতে বাধ্য হয় সরকার। তবে নতুন আইনের বেশকিছু ধারা ও বিতর্কিত পদক্ষেপ এবং ভ্যাটের একক হার ১৫ শতাংশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানিয়ে আসছেন। তবে আইনটি বাস্তবায়নে সরকারের ওপর আইএমএফ ও সংস্থটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কতিপয় অর্থনীতিবিদ চাপ প্রয়োগ করে আসছেন।

এর সঙ্গে এনবিআরের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত। নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কাস্টমস ক্যাডার থেকে আসা এনবিআরের একজন সদস্যের আগামী কয়েক মাস পর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু আইএমএফপন্থি হিসেবে পরিচিত ওই কর্মকর্তার অবসর ঠেকিয়ে তার চাকরির মেয়াদ বাড়াতে আইএমএফ ঢাকা অফিসের কর্মকর্তারা সরকারের শীর্ষ মহলে তদবিরে ব্যস্ত বলে জানা গেছে। এই অপচেষ্টার সঙ্গে আরও জড়িত সরকারঘনিষ্ঠ একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানও। নতুন ভ্যাট আইন তৈরির সঙ্গেও গবেষণা সংস্থাটি জড়িত বলে জানা গেছে।

এফবিসিসিআই পরিচালক ও বারভিডা সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন বলেন, বাজেটে ভ্যাটসংক্রান্ত পদক্ষেপের কারণে আবাসনশিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়বে। ভ্যাটে মূল্যস্ফীতি বাড়বেই। বিদ্যুতের খরচ বাড়বে। মানুষের কষ্টও বাড়বে। সব মিলিয়ে ভ্যাটের প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে পারে। তার মতে, ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশের বিষয়টি আড়াল করতেই ব্যাংকে আমানতের সুদে আবগারি শুল্ককর বাড়ানো হয়েছে।

এফবিসিসিআইর আরেক পরিচালক ড. কাজী এরতেজা হাসান মনে করেন, ভ্যাট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত করতে এই ষড়যন্ত্র করেছে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেস্বী মহল। দেশি-বিদেশি অনেক চক্র ও আমলা মিলে সরকারের বিরুদ্ধে এই নীলনকশা করেছে। কারণ, সব পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ও নতুন আইন বাস্তবায়ন হলে দেশীয় উৎপাদনশীল শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে যাবে।

এই ভ্যাট নিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা উদ্বিগ্ন। এটা সরকারের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রস্তাবিত ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা খরচের এই বাজেটে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা রাজস্ব খাতের আয় নিশ্চিত করতে সব পণ্য এবং সেবার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। বিতর্কিত এই ভ্যাট আইনের সংশোধনী চেয়ে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন যেসব আপত্তি জানিয়ে আসছেন, তাও আমলে নেয়নি এনবিআর।

প্রস্তাবিত বাজেটের পর্যালোচনা করে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছিলেন, বাজেটের ফলে কম আয়ের মানুষ ভ্যাট ও করের চাপে থাকবে। সব পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বাজেটে যে সামগ্রিক কর কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে কম আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ বাড়বে। এর সঙ্গে ভ্যাটভিত্তিক (নির্ভর) রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে সরকার বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।

প্রাজ্ঞ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংকে বড়লোকদের রাখা টাকায় কর আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু বাজেটে কর আহরণের প্রচেষ্টা হলো যেগুলো দ্রুত নিয়ন্ত্রণ ও আদায় করা যায়, সেখানে করারোপ করা হয়েছে। সৎ করদাতাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। আবার শুধু জনপ্রশাসন দিয়ে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ভ্যাট নিয়ে জাতীয় সংসদে কোনো ধরনের আলোচনা না হওয়ারও সমালোচনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা।

আরেকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ব্যাংকের আমানতে আবগারি শুল্ককর বসানো প্রসঙ্গে বলেন, ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ককর বসানোর পদক্ষেপের মাধ্যমে গ্রাহকদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আর ভ্যাটে সৃষ্ট তিনটি সমস্যা আছে জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ভ্যাটে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। ভোক্তার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। ভ্যাটের হার সবার জন্য সমান হওয়ায় কম আয়ের ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়বে।

আপনার মন্তব্য লিখুন